ভাষা শহীদের জীবনামৃত

ভাষা শহীদদের জীবনামৃত

ভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করার ইতিহাস কেবল বাংলাদেশেই রচিত হয়েছে। আজ যে বাংলা ভাষায় আমরা কথা বলছি তা এমনি এমনি প্রতিষ্ঠা পায়নি। অসংখ্য বাঙালির বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে আমার ভাষার অধিকার। যার নাম ৫২’র ভাষা আন্দোলন। ভাষা আন্দোলন আমাদের জাতীয় জীবনে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বাঙালির জাতিসত্ত্বা বিকাশে এই আন্দোলনের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। বাঙালির কাছে চির প্রেরণার প্রতীক ৫২’র ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান উর্দুকে বাঙালির একমাত্র ভাষা হিসেবে চাপিয়ে দিতে চাইলে শুরু হয় এই আন্দোলন। যাদের মহান আত্মত্যাগের বিনিময়ে ভাষার অধিকার আমরা ফিরে পেয়েছি তাদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করতেই এই লেখা।

ভাষা শহীদ আব্দুস সালাম

ভাষা শহীদ আব্দুস সালাম ফেনী জেলার দাগনভূঁঞা উপজেলার মাতুভূঁঞা ইউনিয়নের বর্তমান সালামনগর গ্রামে কৃষিজীবী পিতা মোহাম্মদ ফাজেল মিয়া ও মাতার নাম দৌলতের নেছার কোল আলো করে ১৯২৫ সালে ২৭ নভেম্বর এই বীর জন্মগ্রহণ করেন। চার ভাই এবং দুই বোনের মধ্যে বয়োঃজেষ্ঠ্য সালাম পড়াশোনা শুরু করেন কৃষ্ণরামপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর তৎকালীন মাতুভূঁই কলিমুল্লাহ মাইনর স্কুলে (বর্তমানে মাতুভূঁইয়া উচ্চ বিদ্যালয়) অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। তারপর আতাতুর্ক মডেল হাই স্কুলে (তৎকালীন দাগনভূঁইয়া আতাতুর্ক হাইস্কুল) ভর্তি হয়ে দশম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। আর্থিক অনটনের কারণে ম্যাট্রিক পরীক্ষা না দিয়েই লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়।

পিতা ফাজেল মিয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তখন ইরাকের বসরায় কর্মরত ছিলেন। সংসারের অভাব অনটনে নিজেকেই ধরতে হয় সংসারের হাল। এজন্য গমন করেন কলকাতা। মেটিয়াবুরুজে তার বড় বোনের স্বামী আবদুল কাদেরের সহায়তায় কাজ শুরু করেন কলকাতা বন্দরে। ভারত ভাগের পর ১৯৪৭ সালে ফিরে আসেন ঢাকায়। মতিঝিল ‘ডাইরেক্টার অব ইন্ডাষ্ট্রিজ’ এ পিয়নের চাকুরি নেন। বসবাস শুরু করেন আজিমপুর (পলাশী ব্যারাক) ৩৬বি কোয়ার্টারে।

১৯৫২ সালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে ঢাকার রাজপথ যথন উত্তাল তখন সালাম ২৭ বছরের টগবগে যুবক। দেশপ্রেমের অগ্নীমন্ত্রে দীক্ষিত সালাম যোগ দেন সেই ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে। ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে ঢাকা মেডিকেলে কলেজ হাসপাতাল প্রাঙ্গনে হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে যোগ দেন সালাম। পুলিশের বর্বরোচিত গুলিবর্ষণে বরকত, জব্বার, রফিক এবং শফিকসহ অনেকের সঙ্গে সালামও লুটিয়ে পড়েন মাটিতে। সালামকে হাসপাতালে নেয়ার পর ৭ এপ্রিল পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যান পরপারে। দাফন করা হয় আজিমপুর গোরস্থানে।

ফেনীতে সালামের স্মৃতি রক্ষার্থে অসংখ্য কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে। লক্ষ্মণপুর গ্রামের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে সালাম নগর। ২০০০ সালে শহীদ সালামকে মরনোত্তর একুশে পদক দেয়া হয়েছে। তাঁর নামে নির্মাণ করা হয়েছে পাঠাগার এবং জাদুঘর।

ভাষা শহীদ রফিক উদ্দিন আহমদ

ভাষা শহীদ রফিক উদ্দিন আহমদ মানিকগঞ্জ জেলার সিংগাইর থানার তৎকালীন পারিল বলধারা বর্তমান রফিকনগর গ্রামে পিতা আব্দুল লতিফ এবং মাতা রাফিজা খাতুনের ঘর আলো করে ১৯২৬ সালের ৩০ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। পাঁচ ভাই এবং দুই বোনের মধ্যে রফিক সবার বড়। পরিবারেই রফিকের হাতেখড়ি। প্রাথমিক পড়ালেখা শুরু কলকাতার মিত্র ইনস্টিটিউটে। ১৯৪৯ সালে মানিকগঞ্জের বায়রা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। মানিকগঞ্জ দেবেন্দ্রনাথ কলেজে আই. কম শ্রেণীতে ভর্তি হলেও পরবর্তীতে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকায় এসে পিতার সঙ্গে প্রেসের কাজ শুরু করেন। পড়ালেখা পুনরায় শুরু করেন জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হবার মধ্যদিয়ে। এ সময়ই তিনি জড়িয়ে পড়েন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে।

১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে অন্যদের সঙ্গে রফিকও ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বিক্ষোভ মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। অন্যদের মতো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ছেড়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে চলে যান। এসময় পুলিশের একটি গুলি সরাসরি রফিকের মাথার খুলি উড়িয়ে নিয়ে যায়। মগজ ছিটকে গিয়ে অনেক দূরে পরে। দেশপ্রেমিক রফিক সঙ্গে সঙ্গেই শহীদ হন। ধারনা করা হয় রফিক প্রথম ভাষার জন্য শহীদ হন। ঢাকা মেডিকেল হোস্টেলের ১৭ নম্বর রুমের পূর্বদিকে তার নিথর দেহ পড়ে ছিল। ছয় থেকে সাত জন সহযোদ্ধা শহীদ রফিকের মৃত দেহ ধরাধরি করে তার লাশ এনাটমি হলের পেছনের বারান্দায় এনে রাখেন। তাকে দাফন করা হয়েছিল আজিমপুর গোরস্থানে।

ভাষা শহীদ আবুল বরকত

ভাষা শহীদ আবুল বরকত পশ্চিম বঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার কান্দি মহকুমার ভরতপুর থানার বাবলা গ্রামে বাবা মৌলভী শামসুজ্জোহা ওরফে ভুলু মিয়া এবং মা হাসিনা বিবির সংসারে ১৯২৭ সালের ১৩ জুন জন্মগ্রহণ করেন। তার ডাকনাম ছিল আবাই। পরিবারেই পড়াশুনার হাতেখড়ি। বরকত তালিবপুর ইংলিশ হাইস্কুল থেকে ১৯৪৫ সালে মেট্রিক পাশ করেন। বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে ১৯৪৭ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। ১৯৪৮ সালে তিনি বাংলাদেশে এসে পুরানা পল্টন বিষ্ণু প্রিয়া ভবনে মামা আব্দুল মালেক সাহেবের বাসায় থাকতে শুরু করেন। ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ অনার্স কোর্সে। ১৯৫১ সালে বরকত সম্মান পরীক্ষায় ২য় শ্রেণীতে চতুর্থ স্থান অর্জন করেন। এরপর এমএ শেষ পর্বে ভর্তি হন।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন যখন দানা বাঁধছিল তখন থেকেই বরকত ছিলেন সক্রিয়। ব্যানার, পোস্টার এবং প্লেকার্ড নিয়ে তখন থেকেই তিনি রাজপথে। ৫২’র ২১শে ফেব্রুয়ারি পুলিশ এবং ছাত্র জনতার সঙ্গে যখন সংঘর্ষ চলছিলো বরকত তখন মেডিকেল কলেজের ১২ নম্বর শেডের বারান্দায় দাড়িয়ে বিক্ষুদ্ধ ছাত্র-জনতাকে উৎসাহ দিচ্ছিলেন। পুলিশের গুলি এসে বরকতের তলপেটে বিদ্ধ হয়। পরনের নীল হাফ শার্ট, খাকি প্যান্ট ও কাবুলী স্যান্ডেল রক্তে ভিজে যাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী বরকত। সহযোদ্ধাগণ তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। সকল চেষ্টা ব্যর্থ করে রাত ৮টা ১৫ মিনিটে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি ওয়ার্ডে আবুল বরকত পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। সেদিনই গভীর রাতে পুলিশের কড়া প্রহরায় শহীদ বরকতের লাশ আজিমপুর গোরস্থানে দাফন করা হয়।

ভাষা সৈনিক শফিউর রহমান

ভাষা শহীদ শফিউর রহমান ১৯১৮ সালের ২৪ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন অবিভক্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোন্নগরে। পিতা মাহবুবুর রহমান ঢাকার পোস্ট এন্ড টেলিগ্রাফ অফিসের সুপারিনটেনডেন্ট। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পড়াশুনা শেষ করে কলকাতার গভর্ণমেন্ট কমার্শিয়াল কলেজ থেকে আই.কম পাশ করেন। এরপরই চব্বিশ পরগনার সিভিল সাপ্লাই অফিসে কেরানীর চাকরি শুরু করেন। কলকাতার তমিজউদ্দিনের ১২ বছর বয়সী কন্যা আকিলা খাতুনকে বিয়ে করেন। ২২ ফেব্রুয়ারি সাইকেলে চড়ে অফিসের উদ্দেশে রওনা হন শফিউর। সকাল ১০:৩০ মিনিটে পুরান ঢাকার নবাবপুর রোডে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে আন্দোলনরত জনতার ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে। শফিউর তখন গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়েন। গুরুতর আহত শফিউরকে ঢাকা মেডিক্যালে নেয়ার পর অস্ত্রোপাচার করা হয়। কিন্ত বিধি বাম। অস্ত্রোপাচার সফল হলো না। ওইদিন সন্ধ্যা ০৭:০০ টার সময় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

আহত অবস্থায় হাসপাতালের বিছানায় তাঁর ডাক্তার ভাইকে তিনি বলেন, ‘আমার মেয়েকে দেখো। আমি বুঝতে পারছি আমি তার কাছে আর ফিরে যেতে পারব না’। স্ত্রী তখন ধারণ করে গর্ভে ধারণ করে আছে ছেলে শফিকুর রহমানকে।

ভাষা সৈনিক আব্দুল জব্বার

মাতৃভাষা আন্দোলনের বীর শহীদ আবদুল জব্বার ইংরেজি ১৯১৯ সাল, বাংলা ১৩২৬, ২৬ আশ্বিন ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও থানার পাঁচাইর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা আবদুল কাদের। তার পিতার হাসান আলী এবং মাতা সাফাতুন নেছা। পড়াশুনার হাতেখড়ি পরিবারে। তিনি স্থানীয় ধোপাঘাট কৃষ্টবাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কিছুদিন অধ্যয়ন করেন। পরে দারিদ্র্যের কারণে লেখাপড়া ত্যাগ করে পিতাকে কৃষিকাজে সাহায্য করেন। পনের বছর বয়সে জব্বার পরিবারের সঙ্গে অভিমান করে জীবিকান্বেষনের জন্য গৃহত্যাগ করেন। অনেক কষ্ট, ক্ষুধা, যন্ত্রণা নিয়ে অবশেষে নারায়ণগঞ্জে এসে জাহাজ ঘাটে কাজে যুক্ত হন।

প্রায় এক বছর পর তিনি এক ইংরেজ সাহেবদের সান্নিধ্যে আসেন। সাহেবরা তাকে একটি চাকরি দিয়ে বার্মায় পাঠান। সেখানে আবদুল জব্বার দশ-বারো বছর অবস্থান করে দেশে ফিরে আসেন। আবদুল জব্বার দেশে ফিরে আমেনা খাতুন নামে এক যুবতীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

স্ত্রী আমেনা এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেন।  জন্মের ৪ মাস পরে আবদুল জব্বারের শাশুড়ি ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। শাশুড়িকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য ১৯৫২ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারী তিনি ঢাকায় আসেন। শাশুড়িকে হাসপাতালে ভর্তি করে আবদুল জব্বার মেডিকেলের ছাত্রদের আবাসস্থল (ছাত্র ব্যারাক) গফরগাঁও নিবাসী হুরমত আলীর রুমে (২০/৮) উঠেন। ২১ ফেব্রুয়ারি আন্দোলনরত ছাত্রদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হলে, কি হয়েছে দেখবার জন্য তিনি রুম থেকে বের হয়ে আসেন। ঠিক তিনি যখন ছাত্রদের কাছে গিয়ে দাড়ালেন তখনই পুলিশ গুলি শুরু করে। জব্বার গুলিবিদ্ব হন। ছাত্ররা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। সারাদিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে হার মানেন। চিকিৎসকরা জব্বারকে মৃত ঘোষণা করে। তাকে আজিমপুর গোরস্থানে দাফন করা হয়।

নাবালক ভাষা শহীদ অহিউল্লাহ

ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের সর্বকনিষ্ঠ শহীদ অহিউল্লাহ। তিনি রাজমিস্ত্রী হাবিবুর রহমানের ছেলে। ২২শে ফেব্রুয়ারি নবাবপুর রোডে ছাত্ররা বিক্ষোভ প্রদর্শনকালে পুলিশ গুলি চালায়। তখন অহিউল্লাহ নবাবপুর রোডের খোশমহল রেস্টুরেন্টের সামনে দাঁড়ানো। একটা গুলি এসে সরাসরি অহিউল্লাহর মাথায় আঘাত হানে। সঙ্গে সঙ্গে অহিউল্লাহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। ১৯৫২ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি দৈনিক আজাদী পত্রিকায় অহিউল্লাহর শহীদ হওয়ার খবর ছাপানো হয়। পুলিশ তার লাশ গুম করে ফেলে। ফলে তার কবরের কোন খোঁজ পাওয়া যায় নি।

অবশেষে বলবো, জীবনের প্রতিটি কাজে শুদ্ধ বাংলা ভাষা প্রয়োগ করা হলেই এই বীর শহীদদের আত্মা শান্তি পাবে। শহীদ বেদিতে বিশেষ কোন দিবসে ফুল দিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে শহীদদের প্রতি অসম্মানই করা হবে বৈকি!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × one =