বাংলাদেশের কয়েকটি দর্শনীয় স্থান

বাংলাদেশের কয়েকটি দর্শনীয় স্থান

বহুদিন ধরে বহু ক্রোশ দূরে/ বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে,/ দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা/ দেখেতি গিয়াছি সিন্ধু।/ দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া/ ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া,/ একটি ধানের শীষের উপর/ একটি শিশির বিন্দু। রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত এই কবিতার সারমর্ম আমরা অনেকেই জানি। বহু টাকা খরচ করে দূর দেশ ভ্রমণ করেছি অথচ বাংলাদেশের বিখ্যাত জায়গাগুলো দেখা হয়নি এমন অনেকেই আছেন। তারা সময় করে দেখে আসতে পারেন এই পাঁচটি দর্শনীয় স্থান।

সুন্দরবন

সুন্দরবন
ছবি: সুন্দরবন

ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্বের সপ্ত আশ্চর্যের একটি হলো সুন্দরবন। বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী অঞ্চল খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট জেলা এবং ভারতের উত্তর চব্বিশ পরগনা ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জুড়ে এ প্রাকৃতিক বনভূমি বিস্তৃত। গঙ্গা, মেঘনা এবং ব্রহ্মপুত্র নদীত্রয়ের অববাহিকা বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই ম্যানগ্রোভ বনের ঠিকানা। আয়তন প্রায় ১০,০০০ বর্গ কিলোমিটার। যার মধ্যে ৬,০১৭ বর্গ কিলোমিটারের মালিক বাংলাদেশ। সুন্দরবনের গভীর জঙ্গলে রয়েছে সুন্দরী, কেওড়া, গরান, গেওয়াসহ প্রায় ৩৫০ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। ১২০ প্রজাতির মাছ, ২৭০ প্রজাতির পাখি, ৫০০ বাঘ এবং ১৫০০০ চিত্রা হরিণ থাকার খবরও জরিপে প্রকাশ পেয়েছে।

শীতকাল সুন্দরবন ভ্রমণের উপযুক্ত সময়। বনের ভেতরে যাবার একমাত্র উপায় হলো নৌকা। উল্লেখযোগ্য কতগুলো পয়েন্ট হচ্ছে জামতলা সৈকত, মান্দারবাড়িয়া সৈকত, হীরণ পয়েন্ট, দুবলার চর এবং কটকা বিচ।

কিভাবে যাবেন সুন্দরবন

ঢাকা থেকে আপনাকে প্রথমে যেতে হবে খুলনা। সরাসরি খুলনা যাওয়ার জন্য বাস, ট্রেন এবং লঞ্চের ব্যবস্থা রয়েছে। ঢাকা থেকে সোহাগ, হানিফ ও ঈগল পরিবহনের বাস ভোর ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত খুলনার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল থেকে খুলনা যাবার জন্য বিভিন্ন কোম্পানির লঞ্চ রয়েছে।

তবে একা না গিয়ে কোন গ্রুপ গেলে সুন্দরবন ভ্রমণ নিরাপদ, আনন্দদায়ক এবং কম খরচে হবে। কিছু ট্যুর কোম্পানি রয়েছে যারা নিজস্ব তত্ত্বাবধানে সুন্দরবন ট্যুর সম্পন্ন করে থাকে। কয়েকটা ট্যুর প্রতিষ্ঠানের নাম দেয়া হল-

বেঙ্গল ট্যুরস লি. হলিডেস ট্যুর, ফোন- ০১৫৫২৫৫৫৫৫০

দি গাইড ট্যুরস লি. ফোন-০১৭১১৫৪০৪৩১

রূপান্তর ইকো ট্যুরিজম লি. ফোন-০১৭১১৮২৯৪১৪

বর্ষা ট্যুরিজম, ফোন ০১৭১৫২৫১৯৬৩

সুন্দরবন ওয়ার্ন্ডার্স এন্ড এডভেঞ্চার্স লিমিটেড, ফোন ০১৭১১৪৩৯৫৫৭

রয়েল গন্ডোলা ভেসেলের রয়াল ট্যুর, ফোন ০১৭১১২৯৫৭৩৮

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত
ছবি: কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত

কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ১২২ কি. মি.। এখানে বিভিন্ন উপজাতি এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বসবাস। কক্সবাজারে জনপ্রিয় স্থানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো লাবনী বীচ, সুগন্ধা বীচ, কলাতলি বীচ, ইনানী বীচ, হিমছড়ি, মেরিন রোড, সেন্টমার্টিন, রামু বৌদ্ধবিহার, মহেশখালী, সোনাদিয়া দ্বীপ, কুতুবদিয়া দ্বীপ ইত্যাদি।

এ সৈকতের নামকরণ নিয়ে রয়েছে এক বর্ণিল ইতিহাস। প্রথমে এর নাম ছিল পালঙ্গী। এরপর ব্রিটিশ অফিসার হিরাম কক্সের অবদান স্মরণীয় করে রাখতে কক্স সাহেবের বাজার নামে একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৮৬৯ সালে এ বাজার পৌরসভার মর্যাদা লাভ করে।

কিভাবে যাবেন কক্সবাজার

আকাশপথ, রেলপথ এবং সড়কপথ যেকোন পথেই যেতে পারেন কক্সবাজার। বিভিন্ন কোম্পানীর বাস যেমন, এস আলম মার্সিডিজ বেঞ্জ, সৌদিয়া, হানিফ, গ্রীন লাইন পরিবহন, মর্ডান লাইন পরিবহন, স্টার লাইন পরিবহন ইত্যাদি। আকাশ পথে বাংলাদেশ বিমান, ইউএস বাংলা এবং নভোএয়ার ঢাকা-কক্সবাজার নিয়মিত ছেড়ে যাচ্ছে। ঢাকার কমলাপুর এবং বিমানবন্দর থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে সোনার বাংলা, মহানগর এক্সপ্রেস, মহানগর প্রভাতি, তূর্ণা, নিশীথা, চট্টগ্রাম মেইল আলাদা আলাদ সময় ছেড়ে যায়।

নারিকেল জিঞ্জিরা (সেন্টমার্টিন)

ছবি: সেন্টমার্টিন

বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। যার আরএক নাম নারিকেল জিঞ্জিরা। কক্সবাজার থেকে ১২০ কিলোমিটার দক্ষিণে এই দ্বীপ অবস্থিত। এর আয়তন ১৭ বর্গকিলোমিটার। সুবিশাল জলরাশির বুকে সুনীল আকাশ; চারদিকে সারি সারি নারকেল গাছ; প্রাণি ও প্রকৃতির এই গভীর মিতালী ভ্রমণ পিয়াসী যে কাউকে দুর্নিবার আকর্ষণ করে। টেকনাফ উপজেলার বিচ্ছিন্ন একটি ইউনিয়ন হলো সেন্টমার্টিন। যারা পূর্বে রয়েছে মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশ। নৌপথই সেখানে যাবার একমাত্র পথ।

কিভাবে যাবেন সেন্টমার্টিন

ঢাকা থেকে সরাসরি সেন্টমার্টিন যাওয়ার কোন ওয়ে নাই। আপনাকে যেতে হবে টেকনাফ। সেখান থেকে জাহাজ বা ট্রলারে চরে সেন্টমার্টিন। ঢাকা থেকে সরাসরি টেকনাফ যায় এমন অনেক বাস রয়েছে। যেগুলো ফকিরাপুল, আরামবাগ এবং সায়দাবাদ থেকে নিয়মিত ছেড়ে যায়। ভাড়া ৯০০ থেকে ২০০০ টাকার মধ্যে। টেকনাফ থেকে সকাল ৯টার মধ্যে জাহাজ ছেড়ে যায়। তাই সময়টা অবশ্যই মনে রাখতে হবে। যারা কক্সবাজার যাবেন তারাও একদিন সময় নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন অপরূপ সুন্দর এই দ্বীপ। বছরে পাঁচ মাস টেকনাফ থেকে জাহাজ চলাচল করে। অন্য সময় ট্রলার বা স্পীডবোটে চরে যেতে পারবেন।

সেন্টমার্টিনে থাকার জন্য কয়েকটা হোটেল/রিসোর্ট-এর নাম এবং মোবাইল নাম্বার দিয়ে দিলাম যেগুলো আপনাদের কাজে দিবে।

ব্লু মেরিন রিসোর্ট, মোবাইল- ০১৮১৭০৬০০৬৫

কোরাল ভিউ রিসোর্ট, মোবাইল- ০১৯৮০০০৪৭৭৮

নীল দিগন্ত রিসোর্ট, মোবাইল- ০১৩০০৫১০০৪

সাজেক ভ্যালি (Sajek Valley)

ছবি: সাজেক ভ্যালি

বাংলাদেশের অন্যতম দর্শনীয় স্থান সাজেক ভ্যালি। যার অবস্থান চট্টগ্রাম বিভাগের রাঙ্গামটি জেলার বাঘাইছড়ি ইউনিয়নে। এর অবস্থান রাঙামাটিতে হলেও খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা থেকে খুবই কাছে। মাত্র ৪০ কিলোমিটার। সাজেক বাংলদেশের সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন হিসেবে খ্যাত। এর আয়তন ৭০২ বর্গমাইল। ভারতের ত্রিপুরা-মিজোরাম সীমান্তবর্তী এলাকা হলো সাজেক। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা ১৮০০ ফুট।

সাজেক ভ্যালিকে আপনি বলতে পারেন মেঘের রাজ্য। এখানে এসে নিজেকে মনে হতে পারে মেঘের রাজ্যের বাসিন্দা।

কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে সরাসরি খাগড়াছড়ি দীঘিনালা পর্যন্ত যায় শান্তি পরিবহন। এছাড়া খাগড়াছরি পর্যন্ত যেতে পারেন শ্যামলী, সৌদিয়া, এস আলম, ঈগল, বিআরটিসি গাড়িতে। খাগড়াছরি বা দীঘিনালা থেকে চান্দের গাড়ি করে সাজেক।

সাজেকে থাকার জন্য বেশ কয়েকটি রিসোর্ট রয়েছে। যেমন- সেনাবাহিনী পরিচালিত সাজেক রিসোর্ট (মোবাইল-০১৮৫৯-০২৫৬৯৪), মেঘ মাচাং (Megh Machang) ০১৮২২-১৬৮৮৭৭, লুসাই কটেজ (০১৮১৫-৭৬১০৬৫)

জাফলং

ছবি: জাফলং

জাফলং বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন স্পট। সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার ভারতের মেঘালয়-ডাওকি সীমান্তবর্তী এলাকায় এটি অবস্থিত। মেঘালয় পাহাড়ের সৌন্দর্য যেকোন লোককেই মোহিত করবে। পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ জলরাশি, ডাওকি বন্দরের ঝুলন্ত ব্রিজ, বর্ষা-শীতের আলাদা আলাদা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য জাফলংকে অনন্যতা দান করেছে। সিলেট মূল শহর থেকে জাফলঙের দূরত্ব ৬২ কিলোমিটার। জাফলং যাওয়ার পথেই দেখা যাবে তামাবিল।

কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে খুব সহজেই গাড়িতে করে যেতে পারেন সিলেট। সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল, মহাখালী, শ্যামলী এবং আব্দুল্লাপুর থেকে গ্রীন লাইন, এনা, শ্যামলী, ইউনিক, হানিফ ইত্যাদি বাস নিয়মিত সিলেটের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। রেল ভ্রমণের আনন্দও উপভোগ করতে পারেন। ঢাকার কমলাপুর এবং বিমানবন্দর থেকে উপবন, জয়ন্তিকা, পারাবত এবং কালনী এক্সপ্রেস নিয়মিত ছেড়ে যায়। আবার আকাশ পথে বিমানযোগেও যেতে পারেন সিলেট। নিয়মিতভাবে ঢাকা থেকে সিলেটের উদ্দেশে বাংলাদেশ বিমান, রিজেন্ট এয়ার, ইউনাইটেড এয়ার, ইউএস বাংলা ফ্লাইট ছেড়ে যায়।

সিলেটে গিয়ে কোথায় থাকবেন

জেলা পরিষদের রেস্ট হাউজ, উপজেলা হেটকোয়ার্টার। মোবাইল: উপজেলা নির্বাহী – ০১৭৩০-৩৩১০৩৬, কেয়ারটেকার-০১৭৩৭-৬৯৬৭৮৭।

নলজুরী রেস্ট হাউজ, নলজুরী, জাফলং। মোবাইল: নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা পরিষদ, সিলেট; ০১৭১১-৯৬৬০১৯, কেয়ারটেকার-০১৭৫২-২২৬৩৭৫।

গ্রীন পার্ক রেস্ট হাউজ, নলজুরী, জাফলং। যোগাযোগ: বিভাগীয় বন কর্মকর্তা, সিলেট- ০১৭১১-১৮০৫৭৪, কেয়ারটেকার-০১৭৬৬-৮৫৭১৬৮।

সময় সুযোগ করে উল্লিখিত যেকোন যায়গায় ঘুরে আসতে পারেন। এতে কর্মব্যস্ত জীবনের একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পাওয়ার সুযোগ হবে। সুযোগ হবে নৈসর্গিক বিশুদ্ধতায় ডুব দেয়ার। লেখাটি কেমন লেগেছে কমেন্ট বক্সে জানাতে ভুলবেন না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

19 − seven =