কেক বানানোর কড়চা

কেক আমার খুবই পছন্দের একটি খাবার। আমার মতো আপনার মনও হয়তো কেকের নাম শুনলে আঁকুপাঁকু করে। সম্প্রতি জনৈক কেক তৈরির কারিগরের নিকট থেকে জানতে পারলাম যে, বাজারে যেসব কেক তৈরি করা হয় তাতে সাল্টু নামের একটি উপাদান ব্যবহার করা হয়। যা কেক বা রুটিকে দীর্ঘ সময় নরম রাখে কিন্ত মানবদেহের জন্য খুবই বিপজ্জনক। তাই ঘরেই কেক বানানোর অভিযান শুরু করি। কিন্তু কী মুশকিল! আমি তো আগে কখনোই কেক বানাইনি। ‘ঘরে বসে ‌‌কেক বানানোর সহজ উপায়’ শিরোনামে একটি রেসিপির ভিডিও দেখি। তারপর অভিযান শুরু। অনেক বেশিকিছু না লাগলেও একটি সুস্বাদু কেক বানাতে মোটামুটি কিছু জিনিস অবশ্যই লাগে। যাহোক, সেদিন কেক খুব ভালো বানাতে না পারলেও পরে অবশ্য ভালোভাবেই রপ্ত করেছি।

ইতিহাসের পাতা উল্টিয়ে দেখা গেছে প্রাচীন মিশরীয়রা পৃথিবীতে প্রথম কেক বানানোর কৌশল আবিষ্কার করে। ‘দ্য অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি’র ভাষ্যমতে, ‘কেক’ শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হয় ১৩ শতকের শুরুর দিকে। কেক শব্দটি প্রাচীন নর্স শব্দ ‘কাকা’ (Kaka) থেকে উৎপত্তি হয়। খাদ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৭ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইউরোপীয়রা আধুনিক কেক তৈরি করে। তৎকালীন সময়ে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে কেক ব্যবহার করা হলেও বর্তমানে জন্মদিন, বিয়ে, গায়ে হলুদ, বিবাহ বার্ষিকী, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানসহ যেকোন আনন্দ উৎসব উদযাপনে অনেকটা বাধ্যতামূলকভাবেই কেক খাওয়া হয়। কেকের আকার-আকৃতি কেমন হবে তা নির্ভর করে অনুষ্ঠানের ধরন, ব্যক্তির পছন্দ এবং বাজেটের ওপর।

কেক বানাতে প্রয়োজনীয় সামগ্রী

খাবার শুধু স্বাদ হলেই চলবেনা দেখতেও আকর্ষণীয় হওয়া চাই। কেকের ক্ষেত্রেও তাই। কেকের আকৃতি, নকশা, স্বাদ, রঙ ইত্যাদিতে বৈচিত্র আনতে কিছু জিনিসপত্র অবশ্যই লাগবে। তবে চলুন জেনে নেই কিছু সামগ্রী বিষয়ে যেগুলো অবশ্যই লাগবে।

ওভেন

ছবিঃ ওভেন

কেক বানানোতে ইলেক্ট্রিক ওভেন সবচেয়ে ভালো। কারণ, বেকিংয়ের কাজে মাইক্রোওয়েভ ওভেন খুব ভালো পারফরমেন্স দেয় না। তাই যারা প্রথম ওভেন কিনবেন তারা কম্বাইন্ড ওভেন কিনতে পারেন। এতে টাকা বাঁচবে, যায়গা বাঁচবে এবং কাজও হবে দারুন। বাজারে যাদরো, স্যামসাং, প্যানাসনিক, মিয়াকো, নোভাসহ নানা ব্র্যান্ডের কমবাইন্ড, মাইক্রোওয়েভ এবং ইলেকট্রিক ওভেন পাওয়া যায়। অনলাইনে অর্ডার করেও কেনা যায়।

কেক প্যান

ছবিঃ কেক প্যান

কেক বানানোর জন্য নন স্টিকি প্যান হলে ভালো হয়।

কেক ডাইস বা মোল্ড

কেককে পছন্দ অনুসারে আকৃতি দেয়ার জন্য ডাইস বা মোল্ড ব্যবহৃত হয়ে থাকে, যেমন- লাভ শেপ, কার্টুন শেপ, স্মাইলি শেপ, টেডি বেয়ার শেপ, ফ্লাওয়ার শেপ, মাফিন শেপ। এক্ষেত্রে ননস্টিক ডাইস সবচেয়ে ভালো।

এগবিটার

ছবিঃ এগ বিটার

ডিমের সাদা অংশ ফোম করার কাজে এগবিটার ব্যবহার করা হয়। এছাড়া কেক বানানোর বিভিন্ন উপাদানও এটি দিয়ে বিট করা যায়। নোভা, নোকা, মিয়াকোসহ বিদেশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের এগবিটার Jadroo Online শপে পাওয়া যায়।

এগ সেপারেটর

ডিমের সাদা অংশ আলাদা করার কাজে এগ সেপারেটর ব্যবহার করা হয়। বাজারে প্লাস্টিক, স্টীল, কাঠসহ বিভিন্ন উপাদানের তৈরি এগ সেপারেটর পাওয়া যায়।

মেজারিং কাপ এবং স্পুন

মিজারিং কাপ শুধু কেক নয় যেকোন রান্নার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। রান্নার উপকরণগুলো সঠিক পরিমাণে প্রয়োগ করতে মেজারিং কাপ এবং স্পুন ব্যবহার করা ভালো।

ফ্লেভার

পছন্দ মতো ফ্লেভার ব্যবহার করুন, যেমন- ভ্যানিলা, লেমন, স্ট্রবেরি, চকোলেট, লেমন, ফ্রুটস ফ্লেভার এবং এসেঞ্জ।

স্পাচুলা

কেক তৈরিতে স্পাচুলা ব্যবহার অনেকেই করে থাকে। তবে বাধ্যতামূলক নয়। কেক বানানো ছাড়াও অন্যান্য রান্নায় স্প্যাচুলা ব্যবহার করা হয়। এটি নানাভাবে ব্যবহৃত হয়।

কেক টেস্টার

কেক যথাসময়ে হল কিনা, ভিতরে অবস্থা বুঝার জন্য টেস্টার দিয়ে টেস্ট করে নিতে পারেন। এতে পরিবেশনের সময় ঝামেলায় পরতে হবে না।

নজল

ছবিঃ নজল

কেকের ওপর আমরা যেসব নকশা দেখি তা নজল দিয়েই বানানো হয়। বিভিন্ন সাইজ এবং ডিজাইনের নজল বাজারে পাওয়া যায়। ডেকোরেটিং পেন দিয়েও এ কাজ সম্পন্ন করা যায়।

ডেকোরেটিং স্ট্যান্ড

ছবিঃ ডেকোরেটিং স্ট্যান্ড

সুস্বাদু কেক বানানোর পর সুন্দরভাবে ডিসপ্লে না করতে পারলে যেন আবেদন কমে যায়। তাই পছন্দ অনুযায়ী ডেকোরেটিং স্ট্যান্ড ব্যবহার করুন।

কেক স্লাইসার

বড় কেকটা ছোট ছোট পিস করে কাটার জন্য স্লাইসার বা নাইফ অবশ্যই লাগবে।

কিভাবে খুব সহজে কেক বানাবেন

আমি ঘরে বসে মজাদার কেক বানানোর প্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলবো। আমি ভ্যানিলা কেক বানাবো। আপনি আপনার পছন্দ মতো ফ্লেভার নিতে পারেন। কেকটি বানাতে আমি ইলেক্ট্রিক ওভেন ব্যবহার করবো।

প্রথমে প্রয়োজনীয় উপকরণগুলো এক জায়গায় নিয়ে নিন।

উপকরণসমূহ

  • ময়দা ১ থেকে ১/২ কাপ
  • ডিম ৪টি
  • তেল ১/২ কাপ
  • চিনি ১ কাপ
  • লবণ পরিমাণ মতো
  • বেকিং পাউডার ১ থেকে ১/২ চা
  • তরল দুধ ১/৩ কাপ
  • ভ্যানিলা ফ্লেভার বা এসেঞ্জ ২ চা চামচ

চারটি ডিম ভেঙ্গে এগ সেপারেটর দিয়ে কুসুম আলাদা করে নিন। সাদা অংশটুকু এগ বিটার দিয়ে ভালো মতো বিট করে নিন ক্রিমি না হওয়া পর্যন্ত। এরপর এক কাপ চিনি এবং আধা কাপ বা একটু কম তরল দুধ মিশিয়ে আবারও ভালোভাবে বিট করে নিবেন। আপনার যদি ডায়াবেটিস জনিত কোন সমস্যা থাকে সেক্ষেত্রে সুগার বিট ব্যবহার করুন অথবা চিনি কম খাওয়ার প্রবণতা থাকে তবে চিনি কম দিতে পারেন। কেক বানাতে আইসিং সুগার ব্যবহার করুন অথবা শিল পাটায় বেটে মিহি গুড়া করে নিতে পারেন। কারণ, গুড়া চিনি হলে কেক ভালো হয়। এবার তেল এবং ভ্যানিলা মিশিয়ে বিট করুন।

আপনি যদি গান ভালোবাসেন তবে মিউজিক প্লেয়ারে গান প্লে করতে পারেন। আমি কাজ করতে করতে গান শুনতে ভালোবাসি। গান শুনতে শুনতে বাকি কাজটুকু সেরে নিন।

এরপর ময়দা, বেকিং পাউডার এবং ডিমের কুসুম স্পেচুলা দিয়ে মিশিয়ে নিন। প্রয়োজনে হাত দিয়ে মেশান। যাতে করে দলা দলা না থাকে।

এবার প্যানে অয়েল ব্রাশ দিয়ে তেল লাগিয়ে নিন। তার ওপর বেকিং পেপার বিছিয়ে কেকের মিশ্রণ ঢেলে দিন।

এবার ইলেক্ট্রিক ওভেনে ১৭০ ডিগ্রী তাপমাত্রায় ৪০ মিনিট বেক করুন। কেক টেস্টার দিয়ে অথবা টুথপিক দিয়ে পরীক্ষা করে দেখুন হয়েছে কি না। হয়ে গেলে ওভেন থেকে বের করে ঠাণ্ডা হলে স্লাইসার দিয়ে কেটে পরিবেশন করুন মজাদার ভ্যানিলা কেক। আর কোন অনুষ্ঠান থাকলে কেক ডেকোরেশন স্ট্যান্ডে ডিসপ্লে করুন। তারপর পিস পিস করে কেটে পরিবেশন করুন।

আজকে এখানেই ক্ষ্যান্ত দিব। অন্য কোন দিন কথা বলবো চুলা এবং রাইস কুকারে কেক বানানোর প্রক্রিয়া নিয়ে। আপনার কোন মন্তব্য থাকলে কমেন্ট বক্সে জানান। রান্নাঘরের বিভিন্ন বিষয়ে জানতে আমাদের ব্লগ পড়ুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five × 2 =